চলচ্চিত্রের সেকাল ও একাল
[ঋত্বিক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য নাম—যিনি শুধু পরিচালক নন, বরং শিল্পচেতনা, সমাজচেতনা ও মানবিকতার গভীর অনুসন্ধানী। তাঁর সাক্ষাৎকারে আমরা পাই চলচ্চিত্রের প্রাচীন ও আধুনিক ধারা নিয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ, অভিনয়ের দর্শন ও সমাজের প্রতি সিনেমার দায়বদ্ধতা সম্পর্কে অকপট মতামত। প্রমথেশ বড়ুয়ার সৃজনশীলতা থেকে শুরু করে Eisenstein, Godard কিংবা Resnais-এর চলচ্চিত্রভাষা পর্যন্ত ঘটকের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত ও প্রখর। এই সাক্ষাৎকার পাঠককে শুধু চলচ্চিত্রের কারিগরি ও নন্দনতত্ত্ব নয়, বরং শিল্পের সত্যনিষ্ঠতা ও সমাজসচেতনতার গভীর আলোচনায় নিয়ে যায়।
এমন এক প্রেক্ষাপটে এই সাক্ষাৎকারের ভূমিকা পাঠককে ঘটকের চিন্তাজগতের দরজায় পৌঁছে দেয়—যেখানে সিনেমা হয়ে ওঠে সময়ের আয়না, আর শিল্প হয়ে ওঠে মানুষের সত্য ও সৌন্দর্যের নিরন্তর অনুসন্ধান।—বাংলাপুরাণ]
প্রশ্ন: চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাচীন পদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক পদ্ধতির মৌলিক পার্থক্য সম্বন্ধে আপনার ধারণা কী? উভয় পদ্ধতির গুণাগুণ সম্বন্ধে আপনার মতই বা কী?
উত্তর: চলচ্চিত্রের প্রাচীন পদ্ধতি এবং আধুনিক পদ্ধতি বলতে আপনারা কী বোঝাতে চেয়েছেন আমি ঠিক বুঝলাম না। প্রাচীন এবং আধুনিক বলতে কোন্ দেশের কথা বলতে চেয়েছেন আপনারা—আপনারা কি বাংলাদেশের কথা বলতে চেয়েছেন? আমি এখানে মোটামুটি ধরে নিচ্ছি তাই।
পদ্ধতি-পদ্ধতি বুঝি না মশাই, আমার কাছে আজও প্রমথেশ বড়ুয়া ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালক। আমরা কেউই তাঁর পায়ের নখের যোগ্য নই।
আমার আজও মনে পড়ে ‘গৃহদাহে’র সেই অসম্ভব transitiontটা: সেই যে হাইহীল জুতোপরা দুটো পা থেকে সোজা কেটে দুটো আলতামাখা পা পালকি থেকে নাবছে—আমি আজও ভুলব না। এবং ব্যাপারটা ভদ্রলোক করেছিলেন ১৯৩৬ সালে এ কথা ভুলবেন না। আর সেই যে সেই ‘উত্তরায়ণে’ বড়ুয়া সাহেবের জ্বর হওয়ার পরে camera সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে বিছানায় গিয়ে আছড়ে পড়ল সেটাই কি ভোলা যায়! এবং কাণ্ডটা ঘটিয়েছেন ভদ্রলোক David Lean-এর ‘Oliver Twist’-এর বহু আগে। আজকাল subjective camera সম্পর্কে অনেক কথা শুনতে পাই, বিভিন্ন পরিচালক নাকি খুব ভালোভাবে ব্যবহার করেছেন। তাঁরা মহারাজ প্রভাতকুমার বড়ুয়ার ছেলের কাছ থেকে কিছুটা শিখতে পারতেন, তাঁর পায়ের তলায় বসে।
কাজেই ব্যাপারটা মোটামুটি মশাই, আমার কাছে গুলিয়ে গেছে—প্রাচীন আর আধুনিক বলতে আপনারা কী বোঝাতে চেয়েছেন। এ-সব ধরনের কথা শুনলে আমার একটা কথাই মনে হয়—কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘দে গরুর গা ধুইয়ে—’
প্রশ্ন: চলচ্চিত্রে অভিনেতার স্থান ও নাটকে অভিনেতার ভূমিকার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়? সময়ের অতিক্রমণের সঙ্গে অভিনেতার ভূমিকার কী কী বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে বলে আপনার ধারণা?
উত্তর: চলচ্চিত্রে এবং নাটকে অভিনেতার ভূমিকা সম্পূর্ণ বিভিন্ন। তার ব্যবহারিক তফাত ছাড়াও দার্শনিক একটা তফাত আছে। কেন আমরা বলি যে চলচ্চিত্রে শিশুরা সবচেয়ে ভালো অভিনেতা—কথাটা তলিয়ে দেখবার চেষ্টা করবেন। শিশু কিংবা বৃদ্ধ, এবং বিশেষ করে অশিক্ষিত অভিনেতা, চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ভালো উপাদান।
অভিনয়ের ধারা বিজ্ঞান এবং প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যুগে যুগে পালটেছে এবং পালটে যাচ্ছে। আমরা আজকাল behaviourism-এর কথা বলি, ওটাও পুরোনো হয়ে গেছে। Zavattini এখন সেকেলে! Brecht-এর Organon-এর সঙ্গে সমস্ত ব্যাপারটায় একটা ওলটপালট ঘটে গেছে। তারই সূত্র টেনে ধরে এনে ছবিতে Jean Luc Godard এবং আপনারা যাঁর কথা বেশি শুনেছেন সেই Alain Resnais এবং Alain Robbe-Grillet-এর L’année Dernière À Marienbad ছবিতে। এবং বিষয়বস্তু অনুসারে ছবির অভিনয় পদ্ধতি বদলাতে বাধ্য। ‘Seven samurai-তে Toshiro Mifune-কে আপনাদের মনে আছে কি? তাকে কি করে ব্যাখ্যা করবেন?
স্বল্প পরিসরে উত্তরের আকারে ছবিতে এবং নাটকে অভিনয়ের পার্থক্য সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা যায় না।
প্রশ্ন: প্রাচীন ও আধুনিক চলচ্চিত্রের সমাজচেতনার মধ্যে প্রধান কোন্ পার্থক্য আপনার কাছে সবচেয়ে উল্লেখ্য বলে মনে হয়? আপনার মতে চলচ্চিত্রের সামাজিক দায়িত্ব কোনো যুগে অধিকতরভাবে পালিত হয়েছে?
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments